ব্রেকিং

মে দিবসের ইতিহাস ও তাৎপর্য

| বুধবার, ০৮ মে ২০১৯

মে দিবসের ইতিহাস ও তাৎপর্য

সকল শ্রমজীবীদের বৈষম্য নিরসন হোক, নায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হোক। আর্থসামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি পাক। ১ মে,২০১৯ আজ মহান মে দিবস। বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সংহতি এবং উৎসবের দিন হিসেবে উদযাপিত হয় দিনটি। মে দিবসের পেছনে রয়েছে শ্রমিক-শ্রেণির আত্মদান ও বিরোচিত সংগ্রামের ইতিহাস। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ইউরোপে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়। সেটি ছিল পুঁজিবাদী বিকাশের প্রাথমিক যুগ। তখন শ্রমিকদের কাজের কোনো শ্রমঘণ্টা নির্ধারিত ছিল না। ছিল না ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা। যুক্তরাষ্ট্রে স্বতঃস্ফূর্ত ও অসংগঠিতভাবেই অনধিক ১০ ঘণ্টার শ্রমঘণ্টা নির্ধারণ ও অন্যান্য দাবিতে কয়লা খনি শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন শুরু করে। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে পেনসেলভেনিয়ার কয়লা খনি শ্রমিকদের সংঘর্ষে ১০ শ্রমিক নিহত হন। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরে উল্লিখিত অনধিক ১০ ঘণ্টা শ্রমঘণ্টা নির্ধারণের দাবিতে শ্রমিকদের একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি শহরের কেন্দ্রস্থল হে মার্কেটের কাছে পৌঁছলে সৈনিকরা বাধা দেয় এবং সংঘর্ষ বেধে যায়। সৈনিকদের গুলিতে বহুসংখ্যক শ্রমিক নিহত ও আহত হন। শ্রমিকদের রক্তে ভেজা শার্ট নিয়ে মিছিল এগিয়ে চলে। আন্দোলন আরও তীব্র রূপ ধারণ করে। শ্রমিকদের রক্তে রঞ্জিত শার্ট লাল পতাকায় রূপান্তরিত হয়। ধর্মঘট ও প্রতিবাদ মিছিল চলে ৫ মে পর্যন্ত। ইতোমধ্যে ৩ মে ৬ জন এবং ৫ মে আরও ৪ জন শ্রমিক পুলিশের গুলিতে নিহত হন। গ্রেফতার হন শত শত শ্রমিক। পরবর্তীকালে যাদের অনেককেই মৃত্যুদ- দেওয়া হয়। ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবারের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সেন্ট লুইস শ্রমিক সম্মেলনে কাজের সময় ৮ ঘণ্টা নির্ধারণের দাবিতে ‘মে দিবস’ পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নামে খ্যাত কমিউনিস্ট ও সমাজতন্ত্রীদের প্যারিস সম্মেলনে ১ মে তারিখটিকে দেশে দেশে শ্রমিক-শ্রেণির আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত হয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত না হলেও ১৮৯০ সাল থেকে ইউরোপের দেশে দেশে শ্রমিক-শ্রেণি ১ মে, মে দিবস পালন করে আসছে। রুশ বিপ্লব, পশ্চিমা দেশগুলোতে সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সম্প্রসারণের ফলে প্রথমে গুটিকয়েক দেশ ১ মে-কে শ্রমিক দিবস হিসেবে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ ১ মে-কে সর্বজনীন শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। অতঃপর অনেক দেশ এই দিনটিকে রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা করে। কিন্তু পাকিস্তানে এই দিনটিতে জাতীয় ছুটি ছিল না। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুই প্রথম মে দিবসকে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন দুঃখী মানুষের প্রাণপ্রিয় নেতা। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ব্রত। তিনি ভুলে যাননি, ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ৬-দফা দাবিতে আহূত প্রথম হরতালে আদমজী, টঙ্গী ও তেজগাঁওয়ের সংগঠিত শ্রমিকরাই প্রথম লাল পতাকা হাতে ১৪৪ ধারা ভেঙে ঢাকার দিকে আসতে গিয়ে অকাতরে প্রাণ দিয়েছিল। বাঙালির স্বাধিকার ও মুক্তির জন্য প্রথম আত্মদান করেছিল শ্রমিক মনুমিয়াসহ অন্ততপক্ষে ১০ জন শ্রমিক। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানেও ছাত্রদের পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষই ছিলেন চালিকাশক্তি। এ কারণেই ১৯৭১-এর ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু কেবল স্বাধীনতার ডাক দেননি, মুক্তির আহ্বানও জানিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু প্রথমেই বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়েই বাংলাদেশের শ্রমিক-শ্রেণি অসহযোগ আন্দোলনে দেশের সকল কল-কারখানা বন্ধ করে দিয়েছিল। তার ডাকেই হাজার হাজার শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সুতরাং এটা খুবই স্বাভাবিক ছিল যে, বঙ্গবন্ধুর সরকার ১ মে সরকারি ছুটি ঘোষণা করবেন।

Comments

comments

আপনার পছন্দের এলাকার খবর জানতে...

আর্কাইভ